Bangladesh
বিনিয়োগে খরা, আস্থার সংকটে স্থবির অর্থনীতি
উদ্বৃত্ত তারল্য মানেই অলস অর্থ নয়। আমানত থেকে কোনো ব্যাংকের বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) সংরক্ষণের পর বাকি অর্থ উদ্বৃত্ত তারল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংককে মোট আমানতের ১৩ শতাংশ এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে ৪ শতাংশ এসএলআর রাখতে হয়। বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে এই অর্থ রাখার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দুই ধরনের ব্যাংককেই নগদ জমা অনুপাত (সিআরআর) হিসেবে আরও ৪ শতাংশ অর্থ রাখতে হয়।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। আগের মাস জুলাই শেষে এর পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ২৩ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। গত জুনে ছিল ৪ লাখ ১৪ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, বিনিয়োগের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিকল্প হিসেবে এই অর্থের বড় অংশ দিয়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে ঋণ দেওয়ার চেষ্টা করছে ব্যাংকগুলো।পরিসংখ্যান বলছে, কম সুদের ঋণ দিতেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ব্যাংকাররা। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে কম সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এই তহবিল থেকে গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। এই প্যাকেজের আওতায় বন্ধ শিল্প ও সেবাখাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে এ পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, সবুজ কারখানায় রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানি এবং হিমায়িত চিংড়িসহ বিভিন্ন খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে এক টাকাও বিতরণ হয়নি।এবার কৃষি ও পল্লিঋণের চিত্রের দিকে তাকানো যাক। দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানে কৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ। প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। স্বাধীনতার পর থেকে কৃষি উৎপাদন তিন গুণের বেশি বেড়েছে। ধান, স্বাদুপানির মাছ, পাট ও আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব কৃষি খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।চলতি অর্থবছরের শুরুতে কৃষিঋণ বিতরণের গতি কিছুটা বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে ব্যাংকগুলো। এ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা পুরো অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১২ শতাংশ। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কৃষিঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে শস্য উপখাতে, যদিও তা আগের বছরের তুলনায় কম (সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন)।এবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য কৃষি ও পল্লিঋণ খাতে ৩৯ হাজার কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর নিজস্ব শাখা ও অন্যান্য ব্যবস্থার মাধ্যমে বরাদ্দের ৫০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করতে হবে। এই ৫০ শতাংশের মধ্যে শস্য ও ফসল উপখাতে ৫৫ শতাংশ, প্রাণিসম্পদ উপখাতে ২০ শতাংশ এবং মৎস্য উপখাতে ১৫ শতাংশ বিতরণের কথা বলা হয়েছে। আগের নীতিমালায় শস্য ও ফসল উপখাতে ৬০ শতাংশ, প্রাণিসম্পদ উপখাতে ১৫ শতাংশ এবং মৎস্য উপখাতে ১৫ শতাংশ ঋণ বিতরণের কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ এবার প্রাণিসম্পদ উপখাতে ঋণের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে কমানো হয়েছে শস্য ও ফসল উপখাতে।বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—ব্যাংক খাতে তারল্য থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বাড়ছে না। এর কারণ অর্থের অভাব নয়, বরং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের ঘাটতি। একজন উদ্যোক্তা নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে শুধু ঋণের সুদহার বিবেচনা করেন না। তিনি দেখেন, বাজারে চাহিদা কেমন, উৎপাদন ব্যয় কত, গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়মিত পাওয়া যাবে কি না, কর ও নিয়ন্ত্রক নীতি কতটা স্থিতিশীল এবং ভবিষ্যতে ব্যবসার পরিবেশ কেমন থাকবে। এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে ব্যাংকে অর্থ পড়ে থাকলেও উদ্যোক্তা ঋণ নিতে আগ্রহী হন না।উচ্চ সুদহার অবশ্যই বিনিয়োগের পথে একটি বড় বাধা। তবে শুধু সুদহার কমিয়ে সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ঋণের ব্যয় কমলেও যদি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিশ্চয়তা না থাকে, বাজার দুর্বল থাকে, করব্যবস্থা জটিল হয় এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে সংশয় থাকে, তাহলে উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে যাবেন না। তাই বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কর ও অন্যান্য প্রণোদনার ঘোষণা দিলেই হবে না। এসব সুবিধা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। কোন খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে, কোথায় বাধা রয়ে গেছে এবং কোন সরকারি সংস্থার কারণে প্রকল্প আটকে আছে—এসব বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যেসব অবকাঠামো সরাসরি উৎপাদন, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় কমানোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সীমিত রাজস্ব দিয়ে বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করতে হলে ব্যয়ের প্রতিটি টাকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক হিসাবের পাশাপাশি আস্থার ওপরও নির্ভর করে। উদ্যোক্তা যদি মনে করেন, তাঁর বিনিয়োগের পরিবেশ স্থিতিশীল থাকবে, জ্বালানি পাওয়া যাবে, ঋণ পাওয়া সহজ হবে, করনীতি পূর্বানুমানযোগ্য থাকবে এবং নীতি হঠাৎ বদলাবে না, তাহলে তিনি ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হবেন। একই নিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও দিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবার গতিশীল করতে হলে শুধু বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা দিলেই চলবে না, বিনিয়োগের অনুকূল আস্থার পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলেই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের গতি বাড়বে এবং বাংলাদেশও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারবে।বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসালটিংয়ের অর্থায়ন ও সহায়তায় পরিচালিত ‘অনুমোদন বিষয়ে জনমত জরিপ ২০২৬’-এর ফলাফল গত ১৯ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কদের একটি দলের ওপর পরিচালিত এই জরিপে ১০ হাজার ৪১৩টি ফোনকল করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে জনমতকে ‘সতর্ক আশাবাদ’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো থাকলেও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। উত্তরদাতাদের বড় একটি অংশ মনে করেন, আগের তুলনায় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কিছুটা খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে সাধারণ মানুষ তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সামগ্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের কার্যক্রমে সন্তুষ্টি থাকলেও দৈনন্দিন জীবনে প্রকৃত উন্নতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।ব্যাংক খাতের সংস্কার বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের আরেকটি পূর্বশর্ত। দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক। প্রকৃত খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ, সম্পদের গুণগত মান যাচাই, দুর্বল ব্যাংকের সময়বদ্ধ পুনর্গঠন এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভালো ঋণগ্রহীতা ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের একভাবে বিবেচনা করা যাবে না। উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংক খাতে আস্থা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে।এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। এসব প্রতিষ্ঠান কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়ে। জামানতের সীমাবদ্ধতা, ঋণের উচ্চ ব্যয়, জটিল কাগজপত্র এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নিতে অনীহা তাদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে। তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রপ্তানিমুখী খাত, কৃষিভিত্তিক পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন বাড়াতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি ইউনিভার্সিটি]
Discussion
Please Sign In to join the discussion.