Bangla
প্রতিশ্রুত সংস্কার না করলে বিশ^াস হারাবে বাংলাদেশ
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হতে হলে আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এগুলো হলে- এলডিসি উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, উত্তরণের জন্য যে সব সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, সেগুলো করা না হলে বিশ^াস হারাবে বাংলাদেশ। একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজন ‘ব্যতিক্রমী’ কর্মদক্ষতা। এই সময়সীমা বৃদ্ধি কোনো নজির হিসেবে গণ্য হবে না। জাতিসঙ্ঘের সিডিপি স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তারা এ ধরনের আর কোনো অনুরোধ সমর্থন করবে না। আর সমন্বয় কার্যক্রম ইআরডি থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্থানান্তর করা উচিত।রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে গতকাল আয়োজিত ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ : জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এক মিডিয়া সংলাপে লিখিত উপস্থাপনায় তিনি এ কথা বলেন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় উপস্থাপনা তুলে ধরেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান। বক্তব্য রাখেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। ড. দেবপ্রিয় বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, সুদের হার কমানো, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করার মতো কাজগুলো একই সময়ে করতে হবে। আবার বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করাও জরুরি। এই তিনটি লক্ষ্য পরস্পরের পরিপূরক। সরকার যদি সমন্বিতভাবে এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে তা অর্থনীতি ও দেশ উভয়ের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। তিনি বলেন, আগামী তিন বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক চক্রের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময় শেষে দেশ পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে। ফলে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের বিষয়গুলো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই তিনটি লক্ষ্য সময়াবদ্ধ, সমন্বিত ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়ন করাই সরকারের বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব।সংস্কার কর্মসূচি সংসদে নেয়ার প্রস্তাবএলডিসি উত্তরণকে শুধু আমলাতান্ত্রিক বা অর্থনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে না দেখে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, উত্তরণকালীন সংস্কার কর্মসূচি সংসদে নিয়ে আলোচনা করতে হবে, যাতে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়। একই সাথে বিষয়টিকে মন্ত্রিপরিষদের নিয়মিত আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নিজ নিজ দায়িত্বের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি শুধু অর্থ মন্ত্রণালয় বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একার কাজ নয়। এর সাথে জ্বালানি, প্রযুক্তি, নৌপরিবহনসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জড়িত। তাই এটিকে পুরো সরকারের সামগ্রিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি। পাশাপাশি কারিগরি পর্যায়ে ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।প্রকাশ করতে হবে কর্মপরিকল্পনাড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে একটি ড্যাশবোর্ড তৈরি করতে হবে। জাতিসঙ্ঘের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো শুধু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপন করলেই চলবে না, দেশের জনগণকেও তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। কোন প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়িত হলো, কোন মন্ত্রণালয় বা সংস্থা এর দায়িত্বে রয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কী অগ্রগতি হয়েছে, তা নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির দায়িত্ব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) দেয়া হয়েছিল। তখন মূলত উত্তরণের পর বিদ্যমান আর্থিক ও বাজারসুবিধা কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সেটিই ছিল প্রধান বিবেচনা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে উত্তরণ শুধু সুযোগ-সুবিধা ধরে রাখার বিষয় নয়। এটি পুরো অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের সাথে সম্পর্কিত। তাই ইআরডির বর্তমান সক্ষমতার মধ্যে এই বিস্তৃত কর্মসূচি পুরোপুরি পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ফলে উত্তরণ প্রস্তুতি ও সংস্কার কর্মসূচির দায়িত্ব আরো উচ্চপর্যায়ে নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিষয়টিকে শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে প্রয়োজনীয় সমন্বয়, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়নের গতি নিশ্চিত করা কঠিন হবে।সংসদ সদস্যদের নিয়ে সর্বদলীয় ককাস গঠনসিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো বলেন, এলডিসি উত্তরণ ও সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়নে সিপিডির পক্ষ থেকে ২৩টি বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি সংসদে একটি সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি বা ককাস গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি জানান, সব দলের ১০ জন সংসদ সদস্যকে নিয়ে এই ককাস গঠনের বিষয়ে স্পিকারের দফতর থেকে ইতোমধ্যে নোটিশ জারি হয়েছে। শিগগিরই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে। এর মাধ্যমে এলডিসি উত্তরণ ও সংশ্লিষ্ট সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে সংসদ সদস্যদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করা হবে।ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজন ব্যতিক্রমী অর্জনড. দেবপ্রিয় বলেন, জাতিসঙ্ঘের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে তারা সাধুবাদ জানান এবং এটিকে একটি ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তবে মনে রাখতে হবে, এটি একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। তাই এই সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রমী অর্জন দেখাতে হবে। তিনি বলেন, এলডিসি থাকাকালে বাংলাদেশ যেসব বাণিজ্যিক ও আর্থিক সুবিধা পেয়ে এসেছে, সেগুলো থেকে ধাপে ধাপে বেরিয়ে আসার একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে। আগামী বাজেটে কোন কোন খাতে সুবিধা কমানো হবে এবং কোন খাতে নতুন করে সহায়তা বাড়ানো হবে, তা স্পষ্ট করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়হীনতা থাকলে ভবিষ্যতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকার, সংসদ, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জরুরি। ড. দেবপ্রিয় বলেন, এসটিএসর ক্ষেত্রে সংস্কারের একটি স্পষ্ট পথরেখা প্রয়োজন। সরকারি অর্থব্যবস্থা, জ্বালানি, সামাজিক সুরক্ষা এবং লজিস্টিকস খাতে সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনয়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এ ছাড়া রফতানি নগদ প্রণোদনার মতো যেসব আর্থিক সুবিধা আর রাখা সম্ভব নয়। সেগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে নেয়ার পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, পরিকল্পনা ও নথিপত্র তৈরিতে শক্তিশালী ও পারদর্শী হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছুটা দুর্বল। প্রতিশ্রুতি দেয়ার নথিপত্র তৈরিতে বাংলাদেশ যতটা দক্ষ, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ততটা নয়। যেমন- চূড়ান্ত এসটিএস নথিটি ২০২৫ সালে এসে প্রকাশ করা হয়েছে।আন্তর্জাতিক বিশে^ দেয়া প্রতিশ্রুতি বাড়তি চাপ : ড. মোস্তাফিজড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে এবং এটা একটা বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে আমাদের ওপরে। কিন্তু আমি মনে করি যে, এলডিসি উত্তোরণকে বাংলাদেশের কাঠামোগত পরিবর্তন এবং উন্নয়নের একটা অনুঘটক হিসেবে দেখা দরকার। আমাদের ২০৩০ সালে এসডিজি শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী তিন বছরের মধ্যেই কিন্তু আমাদের পঞ্চবার্ষিকী যেটা করা হয়েছে সেটা কিভাবে বাস্তবায়িত হবে এটা আমরা বুঝে যাব। সুতরাং আমাদের হোমওয়ার্কটা করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা এলডিসি হিসেবে যেসব বাজার সুবিধা আরো তিন বছর আমি পাব। এই হিসাবে দেখলে এটা হবে না, এটাকে দেখতে হবে যে এলডিসি উত্তরণকে কিভাবে আমি টেকসই করতে পারি। তিন বছর এটা যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে কিন্তু আমাদের চিন্তার জগতেই একটা পরিবর্তন আসবে। ২০২৯ সালের পরে সেভাবে আমাকে এটা দেখতে হবে। তিনি বলেন, রেডিমেড গার্মেন্টস ১২শ’ বিলিয়ন ডলারের একটা মার্কেট। রেডিমেড গার্মেন্টস এবং টেক্সটাইলস এটার ভিতরে অনেক ধরনের পণ্য বৈচিত্রকরণের সুযোগ আছে। আমরা এমন একটা সেক্টরে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আমরা প্রমাণ করেছি। আমরা দেখছি চায়না থেকে কিন্তু সরে যাচ্ছে ইউএসএ। দেখলাম চায়নার ৫০ শতাংশ রফতানি ইউএসএ মার্কেটে কমেছে। আমাদের কাজ হবে এই বাজারটাকে ধরা।
Discussion
Please Sign In to join the discussion.