Bangla
শান্তির সুবাতাস সন্ধানে
ভেনিজুয়েলার ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত বছরের অতি গোস্সার কারণ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে শুরু করেছিল গোটা বিশ্ব। নওগাঁর নাগরাজপুরের নারায়ণ বাবু আগের শতকে ছাত্রাবস্থায় বিশ্বরাজনীতি নিয়ে একটু আধটু চর্চা করতেন। সে সময় আধা কেজি ট্রটস্কি, এক কেজি ফিদেল ক্যাস্ট্রো, সোয়া কেজি মাও সেতুং, দেড় কেজি পরিমাণ হো চি মিন নিয়ে আলোচনা দিয়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে তারা নাশতা সারতেন। তখন থেকেই তারা লক্ষ করতেন আলফ্রেড নোবেলের ডিনামাইট আবিষ্কারে দুর্গম পাহাড় কাটার পথ তৈরির চেয়ে যুদ্ধে মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে দেখেই নোবেল সাহেব তার বিশাল সম্পত্তিকে মানব কল্যাণে সুচিন্তায় সৃজনশীলতায় সদ্ব্যবহার কর্মকে উৎসাহিত করতে পুরস্কার হিসেবে দেয়ার জন্য উইল করে যান। সে পুরস্কারের তালিকায় ‘শান্তি’র একটি মোটা পুরস্কার আলাদা করে রাখা হয়। নোবেলের ইচ্ছা অনুযায়ী, অন্য নোবেল পুরস্কারগুলো (যেমন— চিকিৎসা, সাহিত্য, অর্থনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন) যেখানে সুইডেনে প্রদান করা হয়, সেখানে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে নরওয়ের নোবেল কমিটি।ধ্রুপদ শাস্ত্রীয় চর্চার মাধ্যমে মানবজাতিকে বৈষয়িক স্বস্তি ও সেবাদানের বিষয়গুলোর চেয়ে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিশ্বসমাজ ও সংসারে শান্তি এবং সংঘর্ষের সামনাসামনি দাঁড় করানোর উদ্যোগকে পরিমিত ও পরিশীলিতকরণে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এবারে ২০২৬ এ নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারক নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। সাইটেশনে বলা হয়েছে ‘For her efforts to promote peace and international law’ শান্তিতে নোবেল পুরস্কার মূলত এবং মুখ্যত বিশ্বব্যাপী শান্তি, মানবাধিকার ও সংলাপকে নৈতিক গুরুত্ব; মানবাধিকার, আইনের শাসন ও মানবসেবার অনেক আন্দোলন ও উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও গতি এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর কণ্ঠকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরে। সুতরাং দিন দিন এই পুরস্কারের তাৎপর্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে কূট সমালোচনাও। নোবেল শান্তি পুরস্কার আদর্শগতভাবে মহান; কিন্তু বাস্তবে এটি রাজনীতি, সময়কাল ও দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতায় প্রভাবিত। বিশ শতকে এই পুরস্কার মোটাদাগে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং সেসব আবিষ্কার ও ব্যবস্থাপনায় স্বপ্নদ্রষ্টাদের পুরস্কৃত করা হতো; কিন্তু একুশ শতকে এসে এই পুরস্কার বিভিন্ন সমালোচনা, রাজনৈতিক মান-অভিমান, হিংসা-বিদ্বেষ প্রতিহিংসার প্রতিভুতে পরিণত হতে দেখা গেছে। ভেনিজুয়েলার রাজনীতিবিদ ও শিল্প প্রকৌশলী মারিয়া কোরিনা মাচাদো প্যারিসকাকে (জন্ম ৭ অক্টোবর ১৯৬৭) ২০২৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। এই পুরস্কারের অতি প্রত্যাশী যিনি ছিলেন তিনি দাবা খেলার স্টাইলে দেশে দেশে যুদ্ধ বাধানো এবং থামানোর রেকর্ড গড়ায় সিদ্ধহস্ত হচ্ছিলেন। শান্তি পুরস্কারের শিকে তার জন্য ছিঁড়ে পড়ার কথা; কিন্তু মাচাদো, তাও আবার ভেনিজুয়েলার, যিনি শুধু তার দেশে মানুষের মধ্যে শান্তির অন্বেষার সুযোগ খুঁজছিলেন, এ জন্য নির্যাতিত হচ্ছিলেন, তাকে দেয়া হলো। নোবেল কমিটির বিবেচনাবোধকে এই পুরস্কার প্রত্যাশী অতি ক্ষমতাধর ব্যক্তি কটাক্ষ করতেই পারেন। প্রকাশ্যে বলতেই পারেন, ‘মাচাদো তার নোবেল পুরস্কার আমাকে দিলে তা হবে সম্মানের।’ মাচাদো তা করেছিলেনও। কিন্তু ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানের শেষ রক্ষা হয়নি। দেশে দেশে শান্তি ও সংঘর্ষ সৃষ্টিতে যার এতগুলো ডিপ্লোমা তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাবেন না— এটা কি হয়? রেগেমেগে এখন মাচাদোর দেশ ভেনিজুয়েলাকে ধরা খেতেই হচ্ছে। নারায়ণ বাবু তার নিজের ঘরেই দেখেছেন স্বঘোষিত ‘শান্তির দূত’ (Sentinel of Peace) সেজেও একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি, সেই পুরস্কার অন্য একজন পাওয়ায় সেই বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিকে একসময় নিজ দেশেই হেনস্তার শিকার হতে হয়; কিন্তু হেনস্তার বাড়াবাড়িটা এমন পর্যায়ে পড়ে যায় যে, শেষমেশ প্রকৃতিই প্রতিশোধ নেয়াতে হঠাৎ হিতে বিপরীত হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন তা প্রকারান্তরে বিশ্বশান্তির পথকে সংঘর্ষের দিকে ধাবিত করার ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। শান্তি ও সংঘর্ষেও এমন মুখোমুখি অবস্থান সচরাচর দেখা যায় না। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনা বহুবার হয়েছে। কারণ শান্তি, যুদ্ধ, কূটনীতি ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো স্বভাবতই ভূরাজনীতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ২০০৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিকে অকাল বা ভবিষ্যৎ-নির্ভর পুরস্কার বলা হয়। অনেকেই বলেন, তখন তার শান্তি উদ্যোগের ফল স্পষ্ট ছিল না, কেউ কেউ এটিও বলেন, পুরস্কারটি বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার আগেই দেয়া হয়েছে। ওবামাকে বহুপক্ষীয় কূটনীতি ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতির জন্য এ পুরস্কার দেয়া হয়। সমালোচনা হয় পুরস্কারটি অত্যন্ত ‘অকালে’ দেয়া হয়েছিল, কেননা পরবর্তীকালে ড্রোন হামলা ও সামরিক অভিযান চলমান ছিল। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ পুরনো। অনেক সমালোচকের মতে, কখনো কখনো পশ্চিমা বা নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পায়। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ-ঘনিষ্ঠ নেতারা তুলনামূলক বেশি স্বীকৃতি পান এমন অভিযোগ রয়েছে। কিছু পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তির অতীত বা পরবর্তী কর্মকাণ্ড শান্তির ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হয়, যেমন ১৯৭৩ সালে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হেনরি কিসিঞ্জারকে প্রদত্ত শান্তি পুরস্কারটি। কেননা, ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তার ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়। তিনি নিজেই ভিয়েতনাম যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক ছিলেন, কম্বোডিয়া ও লাওসে গোপন বোমা হামলার সাথে যুক্ত ছিলেন। তাকে পুরস্কৃত করার প্রতিক্রিয়ায় সে সময় নোবেল কমিটির দুই সদস্য পদত্যাগ করেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের উপেক্ষার উদাহরণও আছে। কিছু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শান্তিকর্মী বা নেতাকে পুরস্কার না দেয়াও সমালোচনার কারণ হয়েছিল। যেমন— মহাত্মা গান্ধী কখনোই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি। গান্ধীকে পাঁচবার (১৯৩৭-৪৮) মনোনীত করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে (তার হত্যার বছর) তাকে পুরস্কার দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়। গান্ধী নিহত হওয়ার পর নোবেল কমিটি বলে : There was no suitable living candidate. গান্ধীকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার না দেয়ার কারণগুলোর অনুসন্ধানে জানা যায়, ঔপনিবেশিক মানসিকতা, তখন নোবেল কমিটিতে ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল ছিল; অহিংস আন্দোলনকে অনেকেই ‘রাজনৈতিক আন্দোলন’ বলে অবমূল্যায়ন করতেন; ‘রাষ্ট্রপ্রধান নন’ এই যুক্তি (গান্ধী কোনো রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান ছিলেন না); সে সময় শান্তি পুরস্কার প্রায়ই রাষ্ট্র বা চুক্তিভিত্তিক শান্তিকে বেশি গুরুত্ব দিত; সর্বোপরি অহিংসার ধারণা তখনো পুরোপুরি গৃহীত ছিল না, গান্ধীর অহিংস দর্শন তখনকার বিশ্বরাজনীতিতে ছিল বিপ্লবী ও অস্বস্তিকর। নোবেল কমিটি পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে, গান্ধীকে পুরস্কার না দেয়াটা ছিল একটি ঐতিহাসিক ভুল।অনেকসময় রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তির অবস্থানটিও ভাবা হয়ে থাকে গুরুত্বপূর্ণ। কখনো রাষ্ট্রপ্রধানদের পুরস্কার দেয়া হলেও তাদের দেশের সামরিক বা দমনমূলক নীতির কারণে প্রশ্ন ওঠে— এ পুরস্কার ব্যক্তি না রাষ্ট্রের কাজের স্বীকৃতি? ১৯৯৪ সালে ইয়াসির আরাফাত, আইজাক রবিন ও শিমন পেরেজকে ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়ার (Oslo Accords) জন্য পুরস্কার দেয়া হয়। তখন বেশ সমালোচনা হয়েছিল। কারণ চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সময়ে সহিংসতা আরো বেড়েছে, ব্যর্থ শান্তিচুক্তির জন্য পুরস্কার কি যুক্তিসঙ্গত এ প্রশ্ন সামনে এসেছে। ২০১২ সালে ইউরোপে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হলে সমালোচনা হয়— কেননা তখনো ইউরোপে অস্ত্র রফতানি ও শরণার্থী সঙ্কট চলছিল, তা ছাড়া একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক জোটকে ‘শান্তি পুরস্কার’ দেয়া কতটা যৌক্তিক এই প্রশ্ন ওঠে। ১৯০১-২০২৫ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেখা যায়, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের দেশভিত্তিক অবস্থানে শীর্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-২৮, যুক্তরাজ্য-১৪, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে-৪৩; আফ্রিকার দেশগুলো মিলিয়ে-১৩, এশিয়ার দেশগুলো থেকে-১০; এর মধ্যে ভারতের নাগরিক/সংস্থা হিসেবে দু’টি নোবেল শান্তি পুরস্কার এসেছে, যেমন— মাদার তেরেসা ১৯৭৯ সালে এবং কৈলাশ সত্যর্থী ২০১৪ সালে; জাপানিরা দু’বার শান্তিতে নোবেল পেয়েছে। একবার ব্যক্তি হিসেবে ১৯৭৪ সালে প্রধানমন্ত্রী Eisaku Sato এবং ২০২৪ সালে জাপানি সংগঠন Nihon Hidankyo হিসেবে, বাংলাদেশের প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংক ২০০৬ সালে এবং পাকিস্তানের ইউসুফ মালালা ২০১৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান।
Discussion
Please Sign In to join the discussion.