Bangla
আয় নেই, রিটার্ন নেই, তবু টিআইএনধারীর জরিমানা কেন?
টিআইএন নিয়েছিলেন কয়েক বছর আগে। তখন প্রয়োজন ছিল। জমি কিনবেন, ব্যাংক হিসাব খুলবেন, ব্যবসা করবেন কিংবা অনলাইনে আয় করবেন, যে কারণেই হোক টিআইএন নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে আর আয় হলো না। কাজও হলো না। রিটার্নও দেওয়া হলো না। এভাবে বছর কেটে গেল। হঠাৎ একদিন কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ। তখনই প্রশ্ন, আয় যখন নেই, করই যখন দিতে হবে না, তাহলে জরিমানা কেন? এখানেই রয়েছে অনেক করদাতার বড় ভুল বোঝাবুঝি।কারণ রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আর কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এক বিষয় নয়। একজন ব্যক্তির করযোগ্য আয় শূন্য হতে পারে, কিন্তু আইন অনুযায়ী তার রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। আর নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে, কর না থাকলেও জরিমানার মুখে পড়ার সুযোগ রয়েছে।বাংলাদেশে টিআইএন নেওয়ার ঘটনা এখন খুবই সাধারণ। চাকরি, ব্যবসা, জমি কেনাবেচা, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা কিংবা বিভিন্ন আর্থিক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনে মানুষ টিআইএন নিচ্ছেন। কেউ আবার ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আয় করবেন ভেবে আগেই টিআইএন নিয়েছেন। কিন্তু প্রয়োজন শেষ হওয়ার পর অনেকেই ধরে নেন, টিআইএন তো শুধু নিয়েছিলাম, আয়ই তো হয়নি, রিটার্ন দেওয়ারও দরকার নেই। এই একটি ধারণাই পরে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬-এ নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তির রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর রিটার্ন দাখিলে বাধ্য হলে ধারা ১৭০ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করতে হয়। অর্থাৎ আয় নেই, এই কথাটিই সবসময় রিটার্ন না দেওয়ার বৈধ কারণ নয়। প্রথমে দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য কি না। যদি বাধ্য হন, তাহলে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।এখানেই আসে জরিমানার বিষয়টি। অনেকেই মনে করেন, করযোগ্য আয় নেই এবং কর পরিশোধযোগ্যও নেই, তাই রিটার্ন দিতে দেরি হলেও কোনো জরিমানা হবে না। কিন্তু রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে কর পরিশোধযোগ্য না থাকলেও জরিমানা প্রযোজ্য হতে পারে।ধরা যাক, একজন করদাতার করযোগ্য আয় নেই। হিসাব করে তার পরিশোধযোগ্য কর দাঁড়াল শূন্য টাকা। তিনি ভাবলেন, করই যখন নেই, রিটার্ন না দিলেও কিছু হবে না। কিন্তু যদি তিনি আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য হন এবং নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন না দেন, তাহলে শুধু কর শূন্য হওয়ার কারণে জরিমানা থেকে মুক্তি নিশ্চিত নয়।কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পাওয়ার আগে বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করা হলে এবং কর পরিশোধযোগ্য না থাকলে ন্যূনতম জরিমানা ৫ হাজার টাকা হতে পারে। অন্যদিকে, নোটিশ পাওয়ার পর রিটার্ন দাখিল করলে প্রযোজ্য ন্যূনতম জরিমানা ১০ হাজার টাকা হতে পারে। অর্থাৎ নোটিশ আসার আগেই বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করলে জরিমানার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে আরও পরিষ্কার করা যায়। ধরা যাক, একজন করদাতার পরিশোধযোগ্য কর ৫০ হাজার টাকা। তিনি যদি কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পাওয়ার আগে নিজ উদ্যোগে বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করেন, তাহলে ধারা ১৭৪(২) অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকার ১০ শতাংশ হয় ৫ হাজার টাকা। প্রযোজ্য ন্যূনতম জরিমানার বিধান বিবেচনায় তার জরিমানা হবে ৫ হাজার টাকা।অন্যদিকে একই করদাতা যদি কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পাওয়ার পর রিটার্ন দাখিল করেন, তাহলে ধারা ১৭৪(৩) অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকার ১৫ শতাংশ হয় ৭ হাজার ৫০০ টাকা। তবে প্রযোজ্য ন্যূনতম জরিমানার কারণে তার জরিমানা হবে ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ একই করদাতা, একই করের পরিমাণ, কিন্তু সময়ের ব্যবধানেই জরিমানার অঙ্ক বদলে যেতে পারে।এখন প্রশ্ন, টিআইএন নেওয়ার যে প্রয়োজন ছিল, সেটি যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে কি রিটার্নের দায়িত্বও শেষ হয়ে যাবে? ধরা যাক, একজন ব্যক্তি জমি কেনার জন্য টিআইএন নিয়েছিলেন। পরে জমি কেনা হয়নি। আবার কেউ ব্যাংকিংয়ের প্রয়োজনে টিআইএন নিয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রয়োজন আর নেই। কেউ অনলাইন ব্যবসা বা ইউটিউব থেকে আয় করার পরিকল্পনায় টিআইএন নিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো আয় হয়নি। এ অবস্থায় টিআইএন নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য শেষ হয়ে গেলেই রিটার্ন দাখিলের আইনগত দায়িত্বও শেষ হয়ে যাবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।প্রথমে দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আয়কর আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য কি না। বাধ্য হলে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। অর্থাৎ টিআইএন কেন নেওয়া হয়েছিল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও রিটার্নের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণের একমাত্র বিষয় নয়।অনেক করদাতার প্রশ্ন, আমার তো কোনো করই নেই, তাহলে রিটার্ন দেব কেন? রিটার্নকে শুধু কর পরিশোধের কাগজ হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যায় না। একজন করদাতার আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় এবং অর্থের উৎসসহ বিভিন্ন আর্থিক তথ্য রিটার্নের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়।একজন ব্যক্তির নিজের উপার্জন না থাকলেও তার সম্পদ থাকতে পারে, পরিবারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন কিংবা নিজের নামে বিভিন্ন ব্যয় হতে পারে। তাই আমার আয় নেই এবং আমার রিটার্ন দেওয়ার প্রয়োজন নেই, এই দুটি বক্তব্য সবসময় একই অর্থ বহন করে না। করযোগ্য আয় না থাকলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী করের পরিমাণ শূন্য হতে পারে। কিন্তু আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।এখন আসা যাক তাদের কথায়, যাদের টিআইএন কয়েক বছর আগে নেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত কোনো রিটার্ন দাখিল করা হয়নি। একসঙ্গে কী করতে হবে, এর উত্তর সবার ক্ষেত্রে একই নয়। টিআইএন গ্রহণের তারিখ, কোন করবর্ষ থেকে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়েছে, আগে কোনো রিটার্ন দাখিল করা হয়েছিল কি না এবং বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কর অবস্থা, এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।বিশেষ করে ১ জুলাই ২০২৫-এর পর টিআইএন নিয়েছেন কিন্তু এখনো রিটার্ন দেননি, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বর্তমান করবর্ষ থেকে নিয়মিত রিটার্ন দাখিল শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে আগের কোনো করবর্ষের রিটার্ন দিতে হবে কি না বা জরিমানা হবে কি না, তা ব্যক্তির পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইন দেখে নিশ্চিত হতে হবে। আর আগে থেকেই টিআইএন থাকলে কিন্তু কয়েক বছর রিটার্ন না দিয়ে থাকলে, কোন কোন বছরের রিটার্ন দেওয়া প্রয়োজন এবং কোনো জরিমানা প্রযোজ্য হবে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করা উচিত।বিলম্বে রিটার্ন দাখিলের কারণে জরিমানা আরোপ হলে অনেকে ব্যক্তিগত অনুরোধের মাধ্যমে জরিমানা কমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত অনুরোধের ভিত্তিতে আইন নির্ধারিত জরিমানা কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই জরিমানা আরোপের আগে বা পরে প্রথমেই দেখতে হবে, কোন করবর্ষের জন্য জরিমানা হয়েছে, কেন হয়েছে এবং কোন আইনি বিধানের অধীনে হয়েছে।তবে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো জরিমানা হওয়ার অপেক্ষা না করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করা। টিআইএন নেওয়ার পর সেটিকে অপ্রয়োজনীয় ভেবে ফেলে রাখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি শুধু আয় নেই বলেও রিটার্নের বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়।প্রথমে নিজের কর অবস্থা যাচাই করতে হবে। আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা দেখতে হবে। থাকলে সময়মতো রিটার্ন দাখিল করতে হবে। আর দীর্ঘদিন রিটার্ন দাখিল না করে থাকলে পূর্ববর্তী করবর্ষগুলোর অবস্থাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।কর ব্যবস্থায় দায়িত্ব শুধু কর পরিশোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সঠিক তথ্য দিয়ে সময়মতো রিটার্ন দাখিল করাও একজন করদাতার গুরুত্বপূর্ণ আইনগত দায়িত্ব। তাই টিআইএন আছে অথচ রিটার্ন দাখিল করছেন না, এমন হলে বিষয়টি অবহেলা না করে নিজের কর অবস্থা যাচাই করা জরুরি। কারণ আজকের ছোট্ট অবহেলাই ভবিষ্যতে জরিমানা, নোটিশ এবং বাড়তি জটিলতার কারণ হতে পারে।মনে রাখতে হবে, করযোগ্য আয় নেই মানেই সব ক্ষেত্রে রিটার্নের প্রয়োজন নেই, এমন নয়। আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। আর সময়মতো রিটার্ন দাখিল করাই জরিমানা ও অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানোর সবচেয়ে নিরাপদ পথ।[লেখক: আয়কর আইনজীবী]
Discussion
Please Sign In to join the discussion.